ধ্বনি ও বর্ণ : বাংলা ব্যাকরণের পূর্ণাঙ্গ রিভিশন নোট (SSC ও HSC)
বাংলা ব্যাকরণের ভিত্তি বুঝতে হলে ধ্বনি ও বর্ণ অধ্যায়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এসএসসি পরীক্ষায় এই অধ্যায় থেকে প্রতি বছরই একাধিক বহুনির্বাচনী (MCQ) প্রশ্ন এসে থাকে। নিচে অধ্যায়টির মূল বিষয়গুলো সহজ ও সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো।
১. ধ্বনি ও বর্ণ
ধ্বনিঃ ভাষার ক্ষুদ্রতম একককে ধ্বনি বলা হয়। কোনো ভাষার বাক্প্রবাহকে সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করলে কতগুলো মৌলিক ধ্বনি পাওয়া যায়। ফুসফুস থেকে বাতাস বের হওয়ার ফলেই সাধারণত ধ্বনির সৃষ্টি হয়। মনে রাখতে হবে, যেকোনো আওয়াজকেই ধ্বনি হিসেবে বিবেচনা করা গেলেও ব্যাকরণের নিয়মে শুধুমাত্র শুধুমাত্র মুখ থেকে বের হওয়া অর্থবোধক আওয়াজকেই ধ্বনি বলা হয়। যেমন, শ্বাস গ্রহণের সময়ও আওয়াজ হয়, বিদ্যালয়ের ছুটির ঘন্টা বাজালেও আওয়াজ হয়, ইত্যাদি।
বর্ণঃ ধ্বনির চাক্ষুষ বা দৃশ্যমান প্রতীককে বর্ণ বলা হয়। সহজ কথায়, ধ্বনি যখন কানে শোনার বিষয় থেকে চোখে দেখার বিষয়ে পরিণত হয়, তখন তাকে বর্ণ বলে। বর্ণকে আরো অনেক নামে অবিহিত করা হয়। যেমন: ধ্বনির লিখিত রূপ, ধ্বনি নির্দেশক চিহ্ন, হরফ, অক্ষর ইত্যাদি। এদের মধ্যে ব্যাকরণে অক্ষরের অন্য অর্থও আছে।
বর্ণমালাঃ কোনো ভাষা লিখে প্রকাশ করার জন্য যে ধ্বনি নির্দেশক চিহ্ন অর্থাৎ বর্ণসমূহ ব্যবহৃত হয়, তাদের সমষ্টিকে বর্ণমালা বলে। অনুরূপভাবে, বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত সবগুলো বর্ণকে একত্রে বাংলা বর্ণমালা বলা হয়। বাংলা বর্ণমালায় মোট ৫০টি বর্ণ রয়েছে।
ধ্বনির প্রকারভেদ
বাংলা ভাষার ধ্বনিগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: স্বরধ্বনি এবং ব্যঞ্জনধ্বনি।
স্বরধ্বনি: সকল ভাষারই কিছু মৌলিক ধ্বনি থাকে, যে ধ্বনিগুলো অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া নিজেই সম্পূর্ণরূপে উচ্চারিত হতে পারে। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ভাষার মৌলিক ধ্বনিগুলোকে স্বরধ্বনি বলে।
ব্যঞ্জনধ্বনি: এই ধ্বনিগুলো স্বরধ্বনির উপর নির্ভরশীল। স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া ব্যঞ্জনধ্বনি স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হতে পারে না।
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির একটি সহজ তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো:
| বৈশিষ্ট্য | স্বরধ্বনি | ব্যঞ্জনধ্বনি |
| উচ্চারণ প্রক্রিয়া | উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস মুখগহ্বরের কোথাও বাধা পায় না। | উচ্চারণের সময় ফুসফুসতাড়িত বাতাস মুখগহ্বরের বিভিন্ন জায়গায় বাধা পায়। |
| মৌলিক সংখ্যা | মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি (ই, এ, অ্যা, আ, অ, ও, উ) | মৌলিক ব্যঞ্জনধ্বনি ৩০টি |
স্বরধ্বনির শ্রেণীবিভাগ
উচ্চারণকালে জিহ্বার অবস্থান, ঠোঁটের আকৃতি, কোমল তালুর অবস্থা এবং চোয়ালের বিস্তার এই ৫টি মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে বাংলা স্বরধ্বনিকে শ্রেণিবিন্যস্ত করা হয়।
১. জিহ্বার অবস্থান: জিহ্বার সামনের বা পেছনের অংশের কমবেশি উত্থানের ওপর ভিত্তি করে স্বরধ্বনি তিন প্রকার।
- সম্মুখ স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বার সামনের অংশ উঁচু হয়, সেগুলোকে সম্মুখ স্বরধ্বনি বলে। সম্মুখ স্বরধ্বনি তিনটি: ই, এ, অ্যা।
- মধ্য স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বার মধ্য অংশ সামান্য উঁচু হয়, সেগুলোকে মধ্য স্বরধ্বনি বলে। মধ্য স্বরধ্বনি একটি: আ।
- পশ্চাৎ স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বার পেছনের অংশ উঁচু হয়, সেগুলোকে পশ্চাৎ স্বরধ্বনি বলে। পশ্চাৎ স্বরধ্বনি তিনটি: উ, ও, অ।
২. জিহ্বার উচ্চতা: জিহ্বার উচ্চতা ভেদে স্বরধ্বনি চার প্রকার:
- উচ্চ স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা মুখবিবরের সবচেয়ে উঁচুতে ওঠে, সে স্বরই উচ্চ স্বরধ্বনি। উচ্চ স্বরধ্বনি দুটি: ই, উ।
- উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা মুখবিবরের উচ্চ ও মধ্য অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে, সে স্বরই উচ্চমধ্য স্বরধ্বনি। উচ্চমধ্য স্বরধ্বনি দুটি: এ, ও।
- নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা মুখবিবরের নিম্ন ও মধ্য অবস্থার মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকে, সে স্বরই নিম্নমধ্য স্বরধ্বনি। নিম্নমধ্য স্বরধ্বনি দুটি: অ্যা, অ।
- নিম্ন স্বরধ্বনি: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা মুখবিবরের সর্বনিম্ন অবস্থানে অবস্থান করে সে স্বরই হচ্ছে নিম্নস্বর। নিম্নস্বর একটি: আ।
৩. ঠোঁটের অবস্থা: ঠোঁটের অবস্থা ভেদে স্বরধ্বনি তিন প্রকার:
- প্রসৃত/অগোলাকার/চ্যাপ্টা: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে ঠোঁট গোল আকার ধারণ করে না, সে স্বরই প্রসৃত বা অগোলাকার স্বরধ্বনি। ই, এ, অ্যা হচ্ছে প্রস্থত স্বরধ্বনি।
- গোলাকার: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে ঠোঁট গোল আকার ধারণ করে, সেই স্বর হচ্ছে গোলাকার স্বরধ্বনি। গোলাকার স্বরধ্বনি তিনটি: অ, ও, উ।
- গোলাকার-অগোলাকারের মধ্যবর্তী: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণে ঠোঁট গোলও হয় না চ্যাপ্টাও হয় না, সে স্বরই মধ্যবর্তী স্বর। মধ্যবর্তী স্বর একটি: আ।
৪. কোমল তালুর অবস্থা: কোমল তালুর অবস্থা বিচারে বাংলা স্বরধ্বনি দুই ধরনের:
- মৌখিক স্বরধ্বনি: ই, এ, অ্যা, আ, অ, ও, উ। (উচ্চারণকালে বাতাস কেবল মুখ দিয়ে বের হয়)।
- অনুনাসিক স্বরধ্বনি: ইঁ, এঁ, অ্যাঁ, আঁ, ওঁ, উঁ। (উচ্চারণকালে কোমল তালু কিছুটা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং বাতাস একইসঙ্গে নাক ও মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে)।
৫. চোয়ালের অবস্থা: চোয়ালের অবস্থা বিচারে স্বরধ্বনি দুই ধরনের: দৃঢ় ও শিথিল স্বরধ্বনি। বাংলা সবগুলো স্বরই দৃঢ় স্বরধ্বনি।
বর্ণের প্রকারভেদ
ধ্বনির মতোই বাংলা ভাষার বর্ণগুলোকেও দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: স্বরবর্ণ এবং ব্যঞ্জনবর্ণ। এদের তুলনামূলক ছক নিম্নরূপ:
| স্বরবর্ণ | ব্যঞ্জনবর্ণ | |
| সংজ্ঞা | স্বরধ্বনির লিখিত রূপকে স্বরবর্ণ বলে। | ব্যঞ্জনধ্বনির লিখিত রূপকে ব্যঞ্জনবর্ণ বলে। |
| মোট সংখ্যা | বাংলা স্বরবর্ণ মোট ১১ টি। | বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণ মোট ৩৯ টি। |
💡 গুরুত্বপূর্ণ নোট: মনে রাখবেন, মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি হলেও মোট স্বরবর্ণ কিন্তু ১১টি। পরীক্ষায় এই সংখ্যাগত পার্থক্যটি গুলিয়ে ফেলবেন না।
২. কারবর্ণ ও অনুবর্ণ (কার, ফলা ও রেফ)
সাধারণত মূল বর্ণের পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালায় নানা ধরনের সহায়ক চিহ্ন বা রূপ ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো কারবর্ণ, অনুবর্ণ, যুক্তবর্ণ ও সংখ্যাবর্ণ।
ক) কারবর্ণ (কার)
স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপগুলোকে কারবর্ণ বা সংক্ষেপে কার বলা হয়। স্বরবর্ণের কার চিহ্ন মোট ১০টি। যথা: া, ি, ী, ু, ূ, ৃ, ে, ৈ, ো, ৌ।
ব্যতিক্রম: 'অ' বর্ণের কোনো সংক্ষিপ্ত রূপ বা কার চিহ্ন নেই।
স্বরবর্ণগুলো ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হলে পূর্ণরূপের বদলে সংক্ষিপ্ত রূপ গ্রহণ করে থাকে। কোনো ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যদি কোনো কার চিহ্ন না থাকে, তবে ধরে নেওয়া হয় সেটির সাথে একটি বিলীন 'অ' ধ্বনি যুক্ত আছে।
খ) অনুবর্ণ (ফলা, রেফ ও বর্ণসংক্ষেপ)
ব্যঞ্জনবর্ণের বিকল্প রূপকে অনুবর্ণ বলা হয়। অনুবর্ণ মূলত তিন প্রকার: ফলা, রেফ, এবং বর্ণসংক্ষেপ।
ফলা: ব্যঞ্জনবর্ণের যেসব সংক্ষিপ্ত রূপ অন্য ব্যঞ্জনবর্ণের নিচে বা ডান পাশে ঝুলে থাকে, তাদেরকে ফলা বলে। বাংলা ব্যাকরণে মোট ৬টি ফলা চিহ্ন আছে। যথা: ন-ফলা, ব-ফলা, ম-ফলা, য-ফলা, র-ফলা, ল-ফলা।
রেফ: ব্যঞ্জনবর্ণ 'র' এর একটি বিশেষ অনুবর্ণ হলো রেফ। ব্যঞ্জনবর্ণ লিখতে ণ এর উপর যেই বাকানো চিহ্নটি রয়েছে তাকে রেফ বলা হয়। রেফ মূলত র্ (র—এ হসন্ত) এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
বর্ণসংক্ষেপ: যখন কোনো ব্যঞ্জনবর্ণকে যুক্তবর্ণে লিখার সময় স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট আকারে বা পরিবর্তিত আকারে লিখা হয়, তাকে বর্ণসংক্ষেপ বলা হয়। বর্ণসংক্ষেপগুলোর মধ্যে 'ৎ' ব্যতিক্রমধর্মী। 'ৎ' ব্যঞ্জনবর্ণ ত-এর বর্ণসংক্ষেপ হওয়া সত্ত্বেও বাংলা বর্ণমালায় স্বতন্ত্র বর্ণ হিসেবে স্বীকৃত।
৩. যুক্তবর্ণ (স্বচ্ছ ও অস্বচ্ছ)
একাধিক বর্ণ একত্রে যুক্ত হয়ে যুক্তবর্ণ তৈরি হয়। দৃশ্যমানতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তবর্ণ দুই প্রকার। যথা:
স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ: যে যুক্তবর্ণগুলো দেখে খুব সহজেই ভেতরের মূল বর্ণগুলোকে চেনা যায়, তাদেরকে স্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বলা হয়। যেমন: ক্ট, প্ট, শ্ছ, ব্জ, ন্ট, গ্ল, ঞ্ঝ ইত্যাদি।
অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ: যে যুক্তবর্ণগুলোর রূপ বদলে যায় এবং দেখে সহজে ভেতরের মূল বর্ণগুলোকে চেনা যায় না, তাদেরকে অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণ বলা হয়।
পরীক্ষার জন্য শীর্ষ ৭টি গুরুত্বপূর্ণ অস্বচ্ছ যুক্তবর্ণের বিশ্লেষণ দেয়া হলো।
| ষ্ণ = ষ্ + ণ | ক্ষ = ক্ + ষ | হ্ম = হ্ + ম |
| ঞ্জ = ঞ + জ | জ্ঞ = জ্ + ঞ | ঞ্চ = ঞ + চ |
| হৃ = হ + ঋ |
📌 এছাড়াও বাংলা ভাষায় সংখ্যা নির্দেশ করার জন্য মোট ১০টি সংখ্যাবর্ণ রয়েছে। এগুলো হলো: ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ০। মনে রাখবেন, ০ থেকে ৯ এই সংখ্যাবর্ণগুলো কিন্তু বাংলা ভাষার ৫০টি বর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণ কোনোটিরই অন্তর্গত নয়। এরা সম্পূর্ণ পৃথক, শুধুমাত্র সংখ্যা প্রকাশের জন্য ব্যবহার করা হয়।
💡 তাহলে কি বাংলা ভাষায় মোট (৫০ + ১০) = ৬০টি বর্ণ! উত্তর হলো: না। যদি প্রশ্ন করা হয় বাংলা বর্ণমালায় মোট কয়টি বর্ণ আছে, তাহলে অবশ্যই ৫০টি সঠিক উত্তর হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলা ব্যকরণের অন্যান্য বিষয়ের নোটগুলো নিচে দেখুন।
📘 বাংলা ২য় পত্র
- প্রকৃতি ও প্রত্যয় কাকে বলে? প্রকারভেদ ও বোর্ড প্রশ্নের উদাহরণ
- ধ্বনি ও বর্ণ : বাংলা ব্যাকরণের পূর্ণাঙ্গ রিভিশন নোট (SSC ও HSC)