← Back to Articles List

মহাবিশ্বের বয়স কিভাবে নির্ধারণ করা হয়?

আশ্চর্যের বিষয় তুচ্ছ মানুষ যার কিনা শত বছরের আয়ু পাওয়াও দুষ্কর সে কোটি কোটি বছর পুরাতন এই ব্রহ্মান্ডের বয়স নির্ধারণ করতে সক্ষম! কিছু বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সাহায্যে মানুষ এই দুঃসাধ্য সাধন করেছে। স্বাভাবিকভাবেই মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন বস্তুটির বয়স নিরুপন করতে পারলে মহাবিশ্বের বয়স সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে। জ্যোর্তিবিজ্ঞানিদের মতে, গ্লোবিউলার ক্লাস্টার ব্রহ্মান্ডের সবচেয়ে পুরাতন বস্তু। একই মহাজাগতিক গ্যাসীয় মেঘ থেকে উৎপন্ন লক্ষ লক্ষ তারকার গুচ্ছকে বলা হয় স্টার ক্লাস্টার। গ্লোবিউলার ক্লাস্টার হচ্ছে এক ধরনের স্টার ক্লাস্টার। একই ক্লাস্টারের অন্তর্ভূক্ত তারকাগুলো পরস্পর খুবই কাছাকাছি অবস্থিত। এ পর্যন্ত খোজ পাওয়া গ্লোবিউলার ক্লাস্টারগুলোর কোনোটাতেই নতুন তারকা গঠন হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই মনে করা হয় এই তারকাগুলো প্রায় একই সময়ে গঠিত হয়েছে।

তারকার কেন্দ্রে হাইড্রোজেন ফিউশনের মাধ্যমে হিলিয়ামে রূপান্তরিত হয় এবং প্রচুর শক্তি উৎপন্ন করে। একটি তারকার জীবদ্দশার ৯০ শতাংশ সময় ধরে এই বিক্রিয়া চলার পর এর হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তারকাটি একটি রেড জায়েন্ট বা লাল দানবে পরিণত হয়। তারকার এই লাল দানবীয় অবস্থা ব্রহ্মান্ডের বয়স নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হার্টজপ্রাং-রাসেল ডায়াগ্রাম জ্যোতির্বিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি চার্ট। এটি সংক্ষেপে এইচ-আর ডায়াগ্রাম নামেও পরিচিত। ড্যানিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এজনার হার্টজপ্রাং এবং আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি নরিস রাসেল ১৯১০ সালে এই ডায়াগ্রাম বা চার্টটি তৈরি করেন। ডায়াগ্রামটিতে তারকাগুলোকে ঔজ্জ্বল্য, তাপমাত্রা ইত্যাদি বৈশিষ্টের ভিত্তিতে স্থান দেওয়া হয়। তারকাগুলোর কেন্দ্রে যখন হাইড্রোজেন ফিউশন চলতে থাকে তখন এরা ডায়াগ্রামের কর্ণ বরাবর অঞ্চলে অবস্থান করে। এই অঞ্চলটি মেইন সিকোয়েন্স নামে পরিচিত। লাল দানবে পরিণত হলে তারকাগুলোর বৈশিষ্টে পরিবর্তন আসে এবং এরা এইচ-আর ডায়াগ্রামের কর্ণ থেকে সরে গিয়ে অন্যথায় অবস্থান নেয়।

শুরুতে একটি ক্লাস্টারের সকল তারকাই মেইন সিকোয়েন্স অঞ্চলে থাকে। সময় অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে এরা একে একে লাল দানবে পরিণত হতে থাকে এবং চার্টের কর্ণ হতে দূরে সরে যায়। কিন্তু সকল তারকা একই সময়ে লাল দানবে রূপান্তরিত হয় না। কারণ ভিন্ন ভিন্ন ভরের তারকার আয়ুষ্কালও ভিন্ন হয়। সবচেয়ে বেশি ভরবিশিষ্ট ও-টাইপ তারকাগুলোর জীবনকাল হয় সংক্ষিপ্ততম। ও-টাইপ তারকাগুলোর হাইড্রোজেন জ্বালানি সর্বোচ্চ ১০ মিলিয়ন ( ১ মিলিয়ন = ১০ লক্ষ) বছরের মধ্যে নিঃশেষ হয়ে যায়। অপরদিকে সবচেয়ে কম ভরবিশিষ্ট এম-টাইপ তারকাগুলোর হাইড্রোজেন জ্বালানি ৫৬০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত চলতে পারে।

আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি যে, হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তারকা লাল দানবে রূপান্তরিত হয় এবং মেইন সিকোয়েন্স অঞ্চল থেকে সরে যায়। এর ফলে মেইন সিকোয়েন্স অঞ্চলে তারকাবিহীন ফাঁকা স্থান তৈরি হয়, যা মেইন সিকোয়েন্স টার্নঅফ নামে পরিচিত। মেইন সিকোয়েন্স টার্নঅফ পর্যবেক্ষণ করে জানা যায় সর্বনিম্ন কত ভরবিশিষ্ট তারকাগুলো লাল দানবে রূপান্তরিত হয়েছে। আর এই তারকার জন্ম থেকে লাল দানবে পরিণত হওয়ার বয়সই হচ্ছে ক্লাস্টারের বয়স। কারণ, ক্লাস্টারের সকল তারকা প্রায় একই সময়ে গঠিত হয়েছে। আর মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরাতন স্টার ক্লাস্টারটির বয়স অবশ্যই মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি হবে। এভাবেই ব্রহ্মান্ডের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়, এটি একটি মাত্র পদ্ধতি।